শনিবার, ১৫ জুন ২০২৪, ০৩:৪০ অপরাহ্ন

ফরিদগঞ্জ মডেল সরঃ প্রাঃ বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীর ওপর নির্যাতনের অভিযোগ উঠেছে, বিচার দাবী

মেঘনার আলো ২৪ ডেস্ক / ৬৬৬ বার পঠিত
আপডেট : সোমবার, ৩১ জুলাই, ২০২৩, ৯:২৬ পূর্বাহ্ণ

ফরিদগঞ্জ মডেল সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীর ওপর অমানবিক নির্যাতনের অভিযোগ উঠেছে।

নির্যাতনের সময় শিক্ষার্থী প্রস্রাব করে দেয়। নির্যাতনের কথা কাউকে বলতে বারণ করে শিক্ষার্থীকে পুলিশের ভয় দেখিয়েছেন প্রধান শিক্ষক হাসিনা আক্তার ডলি।

খবর পেয়ে অভিভাবক বিদ্যালয়ে গেলে তাকেও মানসিক নির্যাতন করা হয়েছে। উপজেলা শিক্ষা অফিসে গিয়েও বিচার পাননি অভিভাবক। নির্যাতনের কারণে শিক্ষার্থী মানসিকভাবে ভেঙ্গে পড়েছে। উপরন্তু, প্রধান শিক্ষকের নির্দেশে গতকাল ৩০-এ জুলাই বিকালে অভিভাবকের কাছ থেকে একটি কাগজে স্বাক্ষর রাখতে চেয়েছেন সহকারী শিক্ষক মো. কাশেম।

সন্তানের পড়ালেখায় ক্ষতির শিকার হবে-এমন দুঃশ্চিন্তায় অস্থির অভিভাবক। তবে, ঘটনা অকপটে স্বীকার ও বিচার দাবী করেছেন শিক্ষার্থীর অভিভাবক। শিক্ষার্থীকে নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে ২৩-এ জুলাই রোববার দুপুরে।

অভিভাবক, শিক্ষার্থী ও প্রত্যক্ষদর্শী জানিয়েছেন, ঋজু চন্দ্র শীল ও ঋক চন্দ্র শীল বিদ্যালয়ে প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী। শ্রেণি পাঠের বিরতিতে ঋজু চন্দ্র শীল বাহির থেকে গিয়ে দেখে বই-খাতা-কলম ভর্তি নিজের স্কুল ব্যাগটি নেই। অপর শিক্ষার্থী জানায়, ব্যাগটি উপরের তলার ডাস্টবিনে
ফেলে দিয়েছে একই শ্রেণির শিক্ষার্থী সিয়াম। বড় ভাই ঋক চন্দ্র শীল ছোট ভাইয়ের কাছে শুনে সিয়ামকে একটি চড় দিয়ে ব্যাগটি উঠিয়ে এনে দেয়।

সিয়ামের নানী ঘটনা শুনে স্কুলের অফিস কক্ষে সিয়ামের কাছে ঋজু চন্দ্র শীলকে ক্ষমা চাইতে বলেন। এতে, ঋজু চন্দ্র শীল সিয়ামের কাছে ক্ষমা চায়।
কিছুক্ষণ পর সিয়ামের বাবা রুবেল (৩৫) বিদ্যালয়ে উপস্থিত হয়ে প্রধান শিক্ষকের নির্দেশে সহকারী শিক্ষক মিতা ঋজু ও ঋক দুই ভাইকে ডেকে নেন।
প্রধান শিক্ষক হাসিনা আক্তার ডলিসহ অন্যান্য শিক্ষকের সামনে সিয়ামের বাবা ঋকের দুই গালে থাপ্পর মারেন। এতে, ঋক ছিটকে দেয়ালে পড়ে, মাথায় আঘাত লাগে ও ব্যথা পায়। ওই সময় ঋক ভয়ে প্রস্রাব করে দেয়।

ঘটনা সেখানেই শেষ নয়। প্রধান শিক্ষক হাসিনা আক্তার ডলি ঋককে ২০ বার কান ধরে ওঠবস করান ও কুমড়ো চেংগি (আধাবসা করে দুই রানের নীচ দিয়ে দুই হাতে কান ধরা) করান। সময় গণনার পর চেঙ্গি থেকে তুলে প্রধান শিক্ষক শাসিয়ে ঋককে বলেন, তুমি ক্লাশে গিয়ে চুপ করে বসে থাকবে। কয়েক মিনিট পর পুনরায় ঋককে ডেকে নিয়ে অফিস কক্ষে বলেন, সিয়ামের বাবা পুলিশ। তুমি এ কথা তোমার বাবা-মাকে বলবে না। বললে ঝামেলা হবে।

প্রধান শিক্ষকের শাসানোর কথা মনে রেখে ঋক বাসায় গিয়ে মাকে বলেনি। তবে, প্রত্যক্ষদর্শী ঋকের মাকে ঘটনা জানান। এতে, তিনি তার স্বামী (ঋকের বাবা)কে ফোনে জানান। তিনি ওই বিদ্যালয়ের পেছনে অবস্থিত বাসায় ছুটে গিয়ে ঘটনা শোনেন। এরপর বিদ্যালয়ে উপস্থিত হয়ে প্রধান শিক্ষককে পাননি। তাকে দেখে কয়েকজন শিক্ষক বলেন, তুমি কেনো এসেছো। বিচার তো হয়ে গেছে। তারা আরও বলেন, ঋককে সিয়ামের বাবা মেরেছে।
এ ব্যপারে প্রত্যক্ষদর্শী শিক্ষার্থী ও অভিভাবক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেছেন, ঋককে সিয়ামের বাবা মেরেছে, ম্যাডাম কান ধরিয়েছেন ও কুমড়ো চেঙ্গি দিয়েছেন। এরপর ঋকের বাবা যান উপজেলা শিক্ষা অফিসে। সেখানে উপস্থিত শিক্ষা অফিসার (ভারপ্রাপ্ত) জহিরুল ইসলাম বলেন, আপনি স্কুলে যান। আমি প্রধান শিক্ষককে বলে দেবো। তিনি বিচার করবেন। ঋকের বাবা পুনরায় বিদ্যালয়ে গেলে প্রধান শিক্ষক বলেন, আপনারা কিছু হলেই উপরে যান। আমি বিচার করতে পারবো না। শিক্ষা অফিস বিচার করবে।

সুমন শীল তার ছেলেদের ওপর নির্যাতনের বর্ণনা ও অন্যান্য বিষয়ে বিস্তারিত স্বীকার করেছেন। ঘটনার বর্ণনা করার সময় তিনি কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন।

তিনি বলেন, আমার ছেলেরা অসুস্থ্য হয়ে পড়েছে। তারা পড়ালেখা করতে পারে না। চোখ বড় করে তাকায়। তিনি আরও বলেন, পড়ানোর জন্য গ্রামের বাড়ি ছেড়ে বিদ্যালয়ের সাথে বাসা ভাড়া নিয়েছি। বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক মোহাম্মদ হোসেন এর কাছে তার ছেলেদের প্রাইভেট পড়ানো হয়েছিল। কিন্তু, ছেলেরা সাধারণভাবে পড়া ও বানান করতে পারতো না। তাই, অন্য স্কুলের শিক্ষক নিয়েছি। এখন তারা ভালোভাবে পড়ালেখা করছে। স্কুলের পরীক্ষায় ভালো নম্বর পেয়েছে। তা দেখে, হোসেন স্যার বলেন, এই তুই তো তিন নম্বরও পাওয়ার কথা না। ৮০ নম্বর পাইলি কেমনে। এ ব্যপারে কথা হয় ঋক ও ঋজুর সাথে। তারা দুই ভাই ঘটনার বর্ণনা দিয়েছে।

এদিকে, গতকাল রোববার (৩০-এ জুলাই) রাতে সিয়ামের বাবা রুবেল ঋককে মারার অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছেন, আমি ঋককে ধমক দিয়েছি। তবে, ঋকের বাবাকে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে ডেকে দুঃখ প্রকাশ করেছি ও বলেছি, আমার ভুল হয়ে গেছে। তুমি এটা মনে রেখো না। একইভাবে ঋকের বাবা সুমন শীল বলেছেন, সিয়ামের বাবা আমার কাছে দুঃখ প্রকাশ করেছেন। তার ওপর আমার অভিযোগ নেই। তবে, বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষকের সামনে এসব ঘটনা কিভাবে ঘটলো ও তিনি উল্টো আমার ছেলেকে নির্যাতন কেনো করলেন- আমি বিচার চাই।

প্রধান শিক্ষক হাসিনা আক্তার ডলি গতকাল সাংবাদিকদের নিকট অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছেন, ঋককে কানে ধরাইনি ও কুমড়ো চেঙ্গি দেইনি, সিয়ামের বাবাও চড় দেয়নি। কথা বলার সময় উত্তেজিত হয়ে তিনি বলেন, বিষয়টি আমি মিউচ্যুয়াল করে দিয়েছি। এরপর, এটা নিয়ে আর কথা বলার কি প্রয়োজন। কিছু না হলে কি বিষয়ে সমাধান করলেন ও ঋকের বাবাকে ডেকে স্বাক্ষর নিতে চাইলেন কেনো। এ প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, এ ব্যপারে ম্যানেজিং কমিটির সদস্যকে জিজ্ঞাসা করেন, আমি স্কুলের কেউ না।

শিক্ষা অফিসার জহিরুল ইসলাম বলেছেন, আমি তো ওই অভিভাবককে বলেছি প্রধান শিক্ষকের কাছে যেতে। তিনি বিচার করবেন। প্রধান শিক্ষক নিজেই তো অভিযুক্ত। তিনি নিজেই নিজের বিচার করবেন কিভাবে। এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, আমি ছুটিতে আছি এখন কথা বলতে পারবো না। কাল অফিসে আসেন।

অপরদিকে, প্রধান শিক্ষক রুবেলের বাবাকে কল দিয়ে বলেন, শিক্ষা অফিসারকে কল দিয়েছে কোন সাংবাদিক তার ফোন নম্বরটি আমাকে দিন। জবাবে রুবেল বলেন, ওই
সাংবাদিক আমার সামনে বসা আছেন। আমি ব্যপারটি দেখছি। তাদের দুজনের কথোপকথনে প্রশ্ন উঠেছে, উপজেলা শিক্ষা অফিসার বিচার করতে অক্ষম ও প্রধানশিক্ষকের কাছে কোনভাবে দায়বদ্ধ কিনা!

অভিবাবকগণ বলেছেন, ফরিদগঞ্জ মডেল সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে এমন ন্যাক্কারজনক ঘটনার বিচার হওয়া প্রয়োজন। না হলে, আমাদের সন্তানদের মনের ভীতরে ভয়-ভীতি ও আতংক বাসা বাঁধবে। এতে, তাদের শারীরিক ও মানিসক অপূরণীয় ক্ষতি সাধিত হবে।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরও খবর

এক ক্লিকে বিভাগের খবর