
চাঁদপুর-ঢাকা নৌরুটে যাত্রী ভোগান্তি, সেবার মানের অবনতি ও যাত্রী সংখ্যা হ্রাস—এই তিন সমস্যার ঘূর্ণাবর্তে নৌপথের জনপ্রিয় এই রুটটি এখন লঞ্চ ব্যবসায়ীদের জন্যও চিন্তার কারণ হয়ে
নৌরুটে দ্রুতগামী লঞ্চের দাবি
চাঁদপুর-ঢাকা নৌরুটে দীর্ঘদিন ধরে চলাচলকারী লঞ্চগুলো সেবার মান ও গতির দিক থেকে পিছিয়ে পড়েছে। যাত্রীদের অভিযোগ, এই রুটের অধিকাংশ লঞ্চ পুরোনো, ধীরগতির ও অস্বস্তিকর। ফলে যাত্রীরা ধীরে ধীরে সড়কপথে ঝুঁকছেন। অথচ একসময় এই রুটে লঞ্চ ছিল যাত্রীদের প্রথম পছন্দ।
সাধারণ যাত্রী, স্থানীয় ব্যবসায়ী ও বিভিন্ন পেশার মানুষ এখন দাবি তুলেছেন—ঢাকা-চাঁদপুর রুটে দ্রুতগামী ও আধুনিক নৌযান চালুর।
এই দাবি বিবেচনায় নিয়ে চাঁদপুরের জেলা প্রশাসক (ডিসি) মোহাম্মদ মোহসীন উদ্দিন জেলাবাসীর পক্ষ থেকে ১৬ অক্টোবর ২০২৫ তারিখে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ে একটি চিঠি পাঠিয়েছেন। ২১ অক্টোবর সকালে তিনি গণমাধ্যমে বিষয়টি নিশ্চিত করেন।
নৌবন্দর ও যাত্রীসেবার বাস্তবতা
একসময় ডাকাতিয়া নদীর তীরে ছিল চাঁদপুর নৌবন্দর। কিন্তু নদীর নাব্যতা হ্রাস ও ভৌগোলিক ঝুঁকির কারণে পরবর্তীতে শহরের নিশি বিল্ডিং এলাকায় স্থানান্তর করা হয় বন্দরের কার্যক্রম। সেখানে বর্তমানে গড়ে উঠছে আধুনিক নৌবন্দর।
যাত্রীদের অভিমত, বন্দর আধুনিক হলেও রুটে চলাচলকারী লঞ্চগুলোকে আধুনিক ও দ্রুতগামী না করা পর্যন্ত যাত্রীসেবার মান কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে পৌঁছাবে না।
চাঁদপুর পুরাণবাজার ডিগ্রি কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ অধ্যাপক দেলোয়ার আহমেদ বলেন, “এই রুটের লঞ্চগুলোতে কোনো উন্নতি হয়নি। শীত বা গরম—দুই মৌসুমেই এসির ভাড়া একই থাকে, কিন্তু সেবার মান বৃদ্ধি পায় না।”
নাজিরপাড়ার বাসিন্দা সাইদুল ইসলাম বলেন, “আগে মানুষ লঞ্চেই যাতায়াত করতো। এখন সময় বেশি লাগায় সড়কপথে যেতে বাধ্য হচ্ছে। দ্রুতগতির লঞ্চ চালু হলে মানুষ আবার নদীপথে ফিরবে।”
শিক্ষক হাফেজ জাকির হোসেন বলেন, “লঞ্চগুলোর যাত্রীসেবা বৃদ্ধি করা জরুরি। অব্যবস্থাপনার কারণে যাত্রীরা মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। যদি দ্রুতগামী ও আরামদায়ক লঞ্চ চালু হয়, মানুষ আবার এই রুটে ফিরবে।”
জেলা প্রশাসকের প্রস্তাব ও বিশ্লেষণ
জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মোহসীন উদ্দিন তাঁর চিঠিতে উল্লেখ করেছেন—চাঁদপুর নদীবন্দর ঢাকা থেকে বরিশাল বিভাগের বিভিন্ন জেলা এবং চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দরগামী নৌযানগুলোর গুরুত্বপূর্ণ ট্রানজিট পয়েন্ট। পাশাপাশি চাঁদপুরের অবস্থান তিন নদীর মোহনায় এবং ইলিশের বাড়ি হিসেবে এর পর্যটন সম্ভাবনাও বিশাল।
বর্তমানে চাঁদপুর-ঢাকা লঞ্চযাত্রায় সময় লাগে সাড়ে তিন থেকে চার ঘণ্টা, যেখানে সড়কপথে লাগে মাত্র দুই থেকে আড়াই ঘণ্টা। এই সময়ের ব্যবধান যাত্রীদের নৌপথ থেকে বিমুখ করছে। জেলা প্রশাসক মনে করেন—যদি আধুনিক ও দ্রুতগামী লঞ্চ চালু করা যায়, তবে আড়াই ঘণ্টার মধ্যে চাঁদপুর থেকে ঢাকায় পৌঁছানো সম্ভব হবে।
তিনি বলেন, “চাঁদপুর-ঢাকা নৌরুট সচল রাখতে হলে আধুনিক ও দ্রুতগতির লঞ্চ চালু, বিদ্যমান লঞ্চ সংস্কার ও সেবার মান বৃদ্ধি জরুরি। নৌরুটের যাত্রীসেবা উন্নত না হলে ভবিষ্যতে যাত্রীসংখ্যা কমে গিয়ে এই রুটের লঞ্চ সেবা বন্ধ হয়ে যেতে পারে।”
লঞ্চ মালিকদের ভূমিকা ও সম্ভাবনা
লঞ্চ ব্যবসায়ীদের একটি শক্তিশালী সমিতি রয়েছে। অনেক সময় তারা নীতিগত সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলতে সক্ষম। তাই জেলা প্রশাসকের প্রেরিত চিঠির কার্যকারিতা হয়তো তদবির বা প্রশাসনিক প্রক্রিয়ায় আটকে দেওয়া সম্ভব, কিন্তু যাত্রী হ্রাসের বাস্তবতা ঠেকানো যাবে না।
চিঠিটির পর যদি লঞ্চ মালিকরা জরুরি সভা ডেকে লঞ্চগুলোকে আধুনিকায়ন, ইঞ্জিন সংস্কার ও যাত্রীবান্ধব করার উদ্যোগ নেন, তবে পরিস্থিতি ঘুরে দাঁড়াতে পারে। কিন্তু যদি তারা নেতিবাচক মনোভাব নিয়ে পদক্ষেপ রোধের তদবিরে ব্যস্ত হন, তাহলে চিঠির কার্যকারিতা সাময়িকভাবে ঠেকানো গেলেও নৌরুটের প্রতি মানুষের আস্থা হারানোর প্রক্রিয়া আর থামবে না।
অতীতের শিক্ষা, ভবিষ্যতের পরিকল্পনা
দ্রুতগামী নৌযান চালুর ইতিহাস নতুন নয়। অতীতে চাঁদপুর-ঢাকা রুটে সী-ট্রাক ও স্পিডবোট সার্ভিস চালু করা হয়েছিল। কিন্তু পরপর কয়েকটি দুর্ঘটনায় প্রাণহানির ঘটনা ঘটায় সরকার সেবাগুলো বন্ধ করে দেয়। তাই নতুন করে ছোট আকারের দ্রুতগামী নৌযান চালুর ক্ষেত্রে সতর্কতা অপরিহার্য।
বরং বর্তমানে চলাচলরত বড় লঞ্চগুলো কীভাবে দু’ঘণ্টা থেকে আড়াই ঘণ্টার মধ্যে গন্তব্যে পৌঁছাতে পারে, সে বিষয়ে মালিকদের সঙ্গে আলোচনা করাই যুক্তিযুক্ত হবে। তাদের পরামর্শ অনুযায়ী ডুবোচর খনন, রুট সংস্কার ও নিরাপত্তা জোরদারের উদ্যোগ নেওয়া দরকার।
জেলা প্রশাসকের চিঠি নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ে কতটা কার্যকর হবে, তা সময়ই বলে দেবে। তবে একটি বিষয় নিশ্চিত—চিঠিটি থামানো গেলেও যাত্রী হ্রাস ঠেকানো যাবে না। কারণ যাত্রীরা এখন সময় ও সেবার মানে সচেতন। আধুনিকায়ন ছাড়া চাঁদপুর-ঢাকা নৌরুটের গৌরব ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়।